বাংলায় হিন্দু ধর্মগ্রন্থ

এখানে হিন্দু ধর্মগ্রন্থের মূল পাঠ আর তার সহজ বাংলা ব্যাখ্যা একসঙ্গে রাখা হয়েছে। আপাতত এই সংগ্রহে আছে রামায়ণ আর হনুমান চালিসা। দুটি পাঠের পরিচয়ের পাশাপাশি এই পাতায় বাংলায় হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পড়ার রীতি নিয়েও কিছু কথা বলা হয়েছে।

লেখা হয়েছে
এই সংগ্রহের গ্রন্থ

হিন্দু ধর্মগ্রন্থের নানা স্তর

হিন্দু ধর্মে এমন কোনো একটি বই নেই, যাকে সব সম্প্রদায় একমাত্র ধর্মগ্রন্থ বলে মানে। প্রচলিত ভাগ অনুযায়ী বেদ আর উপনিষদকে বলা হয় শ্রুতি, কারণ বিশ্বাস করা হয় ঋষিরা এই জ্ঞান ধ্যানে শুনেছিলেন। এর পরে আছে স্মৃতি: ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ আর দুই মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত, যাদের ইতিহাস নামেও ডাকা হয়। ভগবদ্গীতা মহাভারতেরই একটি অংশ।

এই সংস্কৃত গ্রন্থগুলির পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি ভারতীয় ভাষায় গড়ে উঠেছে ভক্তিসাহিত্য: দেবদেবীর স্তোত্র, মহাকাব্যের নতুন রূপ আর ভক্ত কবিদের গান। সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মের কথা অনেক সময় এই পথেই পৌঁছেছে। সংস্কৃত সবাই পড়তে পারতেন না, কিন্তু নিজের ভাষার পাঁচালী বা গান সবাই বুঝতেন।

ধর্মগ্রন্থ বলতে তাই শুধু বড় বড় শাস্ত্র নয়, ছোট স্তোত্র আর প্রার্থনাও। এগুলি মুখস্থ করে রোজ পাঠ করা যায়, আর অনেক পরিবারে মুখে মুখেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছায়। হনুমান চালিসা তেমনই একটি স্তোত্র।

বাংলায় হিন্দু ধর্মগ্রন্থের ঐতিহ্য

বাংলায় এই ধারার সবচেয়ে পরিচিত নাম কৃত্তিবাস ওঝা, যাঁর বাংলা রামায়ণ কয়েকশো বছর ধরে গ্রামে-শহরে পড়া আর গাওয়া হয়ে আসছে। সপ্তদশ শতকে কাশীরাম দাস লেখেন বাংলা মহাভারত। কৃত্তিবাসী রামায়ণ আর কাশীদাসী মহাভারত, এই দুটি নাম বাঙালি পরিবারে প্রায় একসঙ্গে উচ্চারিত হয়।

এর বাইরেও আছে মঙ্গলকাব্যের দীর্ঘ ধারা, যেমন মনসামঙ্গল, মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল আর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল। চৈতন্যদেবকে ঘিরে গড়ে ওঠা বৈষ্ণব আন্দোলন বাংলাকে দিয়েছে পদাবলি কীর্তন আর কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত। অষ্টাদশ শতকে রামপ্রসাদ সেনের শ্যামাসংগীত শাক্ত ভক্তির গানকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।

সংস্কৃত পাঠ বাংলা লিপিতে

বাংলার পণ্ডিতেরা বহু শতাব্দী ধরে সংস্কৃত লিখেছেন বাংলা লিপিতেই। নবদ্বীপের মতো বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রে সংস্কৃত পুথি লেখা হত বাংলা অক্ষরে, আর ছাপাখানা আসার পরও গীতা, চণ্ডী বা পূজার মন্ত্রের বই বেশির ভাগ বাংলা লিপিতেই ছাপা হয়েছে। তাই অনেক বাঙালি দেবনাগরী না জেনেও সংস্কৃত মন্ত্র পড়তে পারেন।

এই সংগ্রহ সেই রীতি মেনে চলে। সংস্কৃত শ্লোক আর অবধি ভাষার চালিসা দেবনাগরী থেকে অক্ষর ধরে বাংলা লিপিতে দেওয়া হয়েছে, কিছু বদলানো বা অনুবাদ করা হয়নি। বাংলা লিপিতে কয়েকটি ধ্বনির উচ্চারণ হিন্দি বা সংস্কৃতের চেয়ে আলাদা হয়ে যায়। যেমন দেবনাগরীতে বর্গীয় ব আর অন্তঃস্থ ব দুটি আলাদা অক্ষর, কিন্তু বাংলায় দুটোই লেখা হয় ব দিয়ে। যে পাতায় এই তফাত জরুরি, সেখানে আলাদা করে উচ্চারণের নির্দেশ দেওয়া আছে।

ঘরে ঘরে পাঠ আর শোনার রীতি

বাংলায় ধর্মগ্রন্থ যতটা পড়া হয়, তার চেয়ে বেশি হয়তো শোনা হয়। বহু পরিবারে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়া হয়, পূর্ণিমা বা বিশেষ দিনে সত্যনারায়ণের পূজায় পাঁচালী পাঠ হয়। দুর্গাপূজার সময় চণ্ডীপাঠ হয়, আর মহালয়ার ভোরে রেডিওতে চণ্ডীপাঠ শোনা বহু বাঙালির কাছে পূজার শুরু।

আগেকার দিনে কথক ঠাকুরেরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে কথকতা করতেন, অর্থাৎ রামায়ণ, মহাভারত আর পুরাণের কাহিনি সুর করে বলে তার ব্যাখ্যা শোনাতেন। রামায়ণ গান, কীর্তন আর যাত্রাপালার মধ্য দিয়েও এই কাহিনিগুলি মুখে মুখে বেঁচে থেকেছে। আজকের দিনে অনেক মন্দিরে, বিশেষ করে শহরে, মঙ্গলবার আর শনিবার হনুমান চালিসা পাঠও শোনা যায়।

এই সংগ্রহের দুটি পাঠ

রামায়ণের পাতায় আছে বাল্মীকি রামায়ণের একেবারে প্রথম পাঁচটি শ্লোক, যেখানে বাল্মীকি নারদকে জিজ্ঞেস করছেন, এই পৃথিবীতে সব গুণের অধিকারী মানুষটি কে। তার সঙ্গে আছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের তিনটি সনেট, কৃত্তিবাস, রামায়ণ আর বাল্মীকিকে নিয়ে। পাতার প্রবন্ধে কৃত্তিবাসী রামায়ণের ইতিহাস আর বাল্মীকির সঙ্গে তার তফাত নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।

হনুমান চালিসার পাতায় আছে তুলসীদাসের নামে প্রচলিত এই স্তোত্রের পুরো পাঠ: শুরুর দুটি দোহা, চল্লিশটি চৌপাই আর শেষের দোহা। প্রতিটি অংশের অর্থ, তার পেছনের রামায়ণের কাহিনি, বাংলা লিপিতে পড়ার উচ্চারণ-নির্দেশ আর পাঠভেদের কথাও সেখানে পাবেন।

দুটি পাঠ আসলে একই রামকথার দুই দিক। একটিতে রামায়ণের সূচনা আর বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব, অন্যটিতে রামের সবচেয়ে বড় ভক্ত হনুমানের স্তব। তাই পাশাপাশি পড়লে একটি অন্যটিকে বুঝতে সাহায্য করে: চালিসায় সাগর পার হওয়া বা লঙ্কাদহনের যে উল্লেখ, তার পুরো কাহিনি রামায়ণেই।

কীভাবে এই সংগ্রহ ব্যবহার করবেন

যাঁরা নিয়মিত পাঠ করেন, তাঁরা শুধু মূল লাইনগুলি ধরে পড়ে যেতে পারেন। যাঁরা প্রথমবার পড়ছেন বা মানে বুঝে পড়তে চান, তাঁদের জন্য প্রতিটি অংশের সঙ্গে ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। একবারে সবটা না পড়ে প্রতিদিন কয়েকটি শ্লোক বা চৌপাই মানে সহ পড়লেও ধীরে ধীরে পুরো পাঠটি পরিচিত হয়ে ওঠে।

পরিবারে বা গুরুর কাছে যে উচ্চারণ ও পাঠরীতি শেখা হয়েছে, সেটাই অনেকের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। এখানকার ব্যাখ্যা সেই রীতির বদলে নয়, পাশে রাখার জন্য। কোনো শব্দ বা অর্থ নিয়ে সংশয় হলে পাতার শেষে দেওয়া সূত্র থেকে মূল সংস্করণটিও দেখে নিতে পারেন।

পাঠ বাছাই আর যাচাইয়ের নিয়ম

এই সংগ্রহে শুধু সেই পাঠই ছাপা হয়, যা পাবলিক ডোমেনের কোনো সংস্করণের সঙ্গে লাইন ধরে মিলিয়ে দেখা গেছে। কোনো আধুনিক অনুবাদ বা টীকা এখানে তুলে দেওয়া হয় না; ব্যাখ্যা আমাদের নিজেদের লেখা।

এই নিয়মের জন্যই কৃত্তিবাসের নিজের পঙ্ক্তি এখনও এখানে নেই। তাঁর রামায়ণের এমন কোনো পাবলিক ডোমেন প্রতিলিপি আমরা পাইনি, যা লাইন ধরে যাচাই করা যায়। যাচাইযোগ্য সংস্করণ পাওয়া গেলে তা যোগ করা হবে।

এই সংগ্রহের গ্রন্থ

সাধারণ প্রশ্ন

হিন্দু ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ কোনটি?

একটি নির্দিষ্ট বই নেই। ঐতিহ্য অনুযায়ী বেদকে সবচেয়ে প্রামাণ্য ধরা হয়, তবে দৈনন্দিন ধর্মজীবনে গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ আর নানা ভাষার ভক্তিসাহিত্যই বেশি পড়া হয়। কোন গ্রন্থের ওপর কতটা জোর, তা সম্প্রদায় আর অঞ্চলভেদে আলাদা।

এখানে কৃত্তিবাসী রামায়ণের পাঠ নেই কেন?

কৃত্তিবাসের রামায়ণের এমন কোনো পাবলিক ডোমেন প্রতিলিপি আমরা পাইনি, যা লাইন ধরে মিলিয়ে দেখা যায়। তাই রামায়ণের পাতায় আপাতত বাল্মীকির শ্লোক আর মধুসূদনের সনেট রাখা হয়েছে। যাচাইযোগ্য সংস্করণ পেলে কৃত্তিবাসের পাঠ যোগ হবে।

হনুমান চালিসা তো হিন্দি অঞ্চলের, বাংলায় কেন?

চালিসার ভাষা অবধি, যা হিন্দি অঞ্চলের একটি পুরোনো সাহিত্যভাষা। এখানে পাঠটি অনুবাদ করা হয়নি, শুধু অক্ষর ধরে বাংলা লিপিতে লেখা হয়েছে, যাতে বাংলা পড়তে পারেন এমন যে কেউ মূল শব্দেই পাঠ করতে পারেন। প্রতিটি অংশের অর্থ দেওয়া হয়েছে বাংলায়।

পাঠ করার আগে কি কোনো নিয়ম মানতে হয়?

নিয়ম পরিবার আর সম্প্রদায়ভেদে আলাদা। অনেকে স্নান করে, পরিষ্কার জায়গায় বসে, প্রদীপ বা ধূপ জ্বেলে পাঠ করেন। আমরা কোনো নিয়ম বেঁধে দিই না; নিজের পরিবার বা গুরুর রীতি মেনে চলাই ভালো।

ব্যাখ্যাগুলি কি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মত মেনে লেখা?

না। আমরা পাঠের সরল অর্থ বলার চেষ্টা করেছি, আর যেখানে একাধিক ব্যাখ্যা প্রচলিত, সেখানে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করেছি। কোনো একটি সম্প্রদায়ের মতকে চূড়ান্ত বলে ধরা হয়নি।