বাংলায় রামায়ণ
এই পাতায় আছে বাল্মীকি রামায়ণের প্রথম পাঁচটি শ্লোক, বাংলা লিপিতে, আর রামায়ণকে নিয়ে লেখা মাইকেল মধুসূদন দত্তের তিনটি সনেট, প্রতিটির অর্থ সহ। সঙ্গে আছে বাংলার ঘরের রামায়ণ, অর্থাৎ কৃত্তিবাসী রামায়ণের পরিচয়, আর বাল্মীকির সঙ্গে তার তফাতের কথা।
- সংস্করণ:
- বাল্মীকি রামায়ণ, বালকাণ্ড ১.১.১–৫, সংস্কৃত উইকিসংকলনের পাঠ থেকে বাংলা লিপিতে; মধুসূদন দত্তের চতুর্দ্দশপদী-কবিতাবলি (১৮৬৬) থেকে তিনটি সনেট, বাংলা উইকিসংকলনের পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে।
- লেখা হয়েছে
বাল্মীকি রামায়ণের সূচনা: বালকাণ্ড, প্রথম সর্গ, শ্লোক ১–৫
রামায়ণ শুরু হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে। তপস্বী বাল্মীকি দেবর্ষি নারদকে জিজ্ঞেস করেন, এই সময়ে পৃথিবীতে এমন কে আছেন, যাঁর মধ্যে সব গুণ একসঙ্গে মেলে। নিচের পাঁচটি শ্লোক সেই প্রশ্ন; এর পরের শ্লোকগুলিতে নারদ উত্তর দেন আর ইক্ষ্বাকু বংশের রামের কথা বলেন। শ্লোকগুলি অনুষ্টুপ ছন্দে, প্রতিটিতে আট অক্ষরের চারটি চরণ। বাংলার বইয়ে সংস্কৃত যেভাবে ছাপা হয়, এখানেও তেমনই বাংলা লিপিতে দেওয়া হয়েছে।
সংস্করণ: সংস্কৃত উইকিসংকলনের পাঠ (রামায়ণম্, বালকাণ্ডম্, সর্গঃ ১), দেবনাগরী থেকে অক্ষর ধরে বাংলা লিপিতে।
শ্লোক ১.১.১
তপঃ স্বাধ্যায়নিরতং তপস্বী বাগ্বিদাং বরম্।
নারদং পরিপপ্রচ্ছ বাল্মীকির্মুনিপুঙ্গবম্॥
অর্থ: প্রথম শ্লোকে প্রশ্নের প্রেক্ষাপট। তপস্বী বাল্মীকি সবিনয়ে প্রশ্ন করছেন নারদকে, যিনি তপস্যা আর স্বাধ্যায়ে, অর্থাৎ বেদপাঠে, সব সময় মগ্ন। নারদকে বলা হয়েছে বাগ্বিদাং বরম্, মানে কথার মর্ম যাঁরা জানেন তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, আর মুনিপুঙ্গব, অর্থাৎ মুনিদের মধ্যে অগ্রগণ্য।
শ্লোক ১.১.২
কো ন্বস্মিন্সাম্প্রতং লোকে গুণবান্কশ্চ বীর্যবান্।
ধর্মজ্ঞশ্চ কৃতজ্ঞশ্চ সত্যবাক্যো দৃঢব্রতঃ॥
অর্থ: এবার প্রশ্ন শুরু। এখন এই পৃথিবীতে কে গুণবান, কে বীর্যবান? কে ধর্মজ্ঞ, অর্থাৎ ধর্ম কী তা জানেন; কে কৃতজ্ঞ, উপকার মনে রাখেন; কে সত্যবাক্য, সব সময় সত্য বলেন; আর কে দৃঢ়ব্রত, প্রতিজ্ঞা থেকে সরেন না? সাম্প্রতং শব্দটি লক্ষ করার মতো: বাল্মীকি খুঁজছেন নিজের সময়ের মানুষকে।
শ্লোক ১.১.৩
চারিত্রেণ চ কো যুক্তঃ সর্বভূতেষু কো হিতঃ।
বিদ্বান্কঃ কঃ সমর্থশ্চ কশ্চৈকপ্রিয়দর্শনঃ॥
অর্থ: প্রশ্ন চলতে থাকে। কে সচ্চরিত্র, কে সব প্রাণীর হিতকারী? কে বিদ্বান, কে সমর্থ, অর্থাৎ যা করা দরকার তা করতে পারেন? আর কে একপ্রিয়দর্শন, যাঁকে দেখলেই সবার মন ভরে যায়? জ্ঞান আর দক্ষতার পাশে এখানে সব জীবের প্রতি মমতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শ্লোক ১.১.৪
আত্মবান্কো জিতক্রোধো দ্যুতিমান্কোঽনসূয়কঃ।
কস্য বিভ্যতি দেবাশ্চ জাতরোষস্য সংযুগে॥
অর্থ: কে আত্মবান, অর্থাৎ নিজেকে সংযত রাখতে জানেন? কে ক্রোধ জয় করেছেন, কে দীপ্তিমান, আর কে অনসূয়ক, মানে অন্যের ভালোয় ঈর্ষা করেন না? শেষ প্রশ্নটি চমকে দেয়: যুদ্ধে যাঁর রোষ জাগলে দেবতারাও ভয় পান, তিনি কে? ক্রোধজয় আর প্রয়োজনে ভয়ংকর রোষ, শ্লোকটি দুটিকে পাশাপাশি রেখেছে।
শ্লোক ১.১.৫
এতদিচ্ছাম্যহং শ্রোতুং পরং কৌতূহলং হি মে।
মহর্ষে ত্বং সমর্থোঽসি জ্ঞাতুমেবংবিধং নরম্॥
অর্থ: শেষ শ্লোকে বাল্মীকি নিজের আগ্রহের কথা বলেন: এটাই আমি শুনতে চাই, আমার কৌতূহল অপার। হে মহর্ষি, এমন মানুষকে জানার ক্ষমতা আপনারই আছে। প্রচলিত গণনায় দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্লোকের প্রশ্নে ষোলোটি গুণের কথা আছে, আর নারদের উত্তর থেকেই শুরু হয় রামকথার সংক্ষিপ্ত রূপ।
মধুসূদন দত্তের তিনটি সনেট: কৃত্তিবাস, রামায়ণ, বাল্মীকি
বাংলা ভাষায় সনেটের সূচনা মধুসূদনের হাতেই; এই চোদ্দো লাইনের কবিতার নাম তিনি দিয়েছিলেন চতুর্দশপদী। ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত চতুর্দশপদী কবিতাবলীর অনেক সনেট দেশের নদী, কবি, উৎসব আর পুরাণকে নিয়ে। নিচের তিনটিতে তিনি প্রণাম জানিয়েছেন কৃত্তিবাসকে, রামায়ণের গানকে আর আদিকবি বাল্মীকিকে। ভাষা সাধু রীতির, ক্রিয়াপদ পুরোনো ধাঁচের, যেমন দিলা, গাইলা, দেখিনু; তাই প্রতিটি সনেটের সঙ্গে তার সরল অর্থ দেওয়া হয়েছে।
সংস্করণ: চতুর্দ্দশপদী-কবিতাবলি (১৮৬৬), বাংলা উইকিসংকলনের পাঠ; কবির সময়ের বানান, যেমন কীর্ত্তি বা পূর্ব্ব, বদলানো হয়নি।
কৃত্তিবাস
জনক জননী তব দিলা শুভ ক্ষণে
কৃত্তিবাস নাম তোমা!— কীর্ত্তির বসতি
সতত তোমার নামে সুবঙ্গ-ভবনে,
কোকিলের কণ্ঠে যথা স্বর, কবিপতি,
নয়নরঞ্জন-রূপ কুসুম-যৌবনে,
রশ্মি মাণিকের দেহে। আপনি ভারতী,
বুঝি কয়ে দিলা নাম নিশার স্বপনে,
পূর্ব্ব-জনমের তব স্মরি হে ভকতি!
পবন-নন্দন হনু, লঙ্ঘি ভীমবলে
সাগর, ঢালিলা যথা রাঘবের কানে
সীতার বারতা-রূপ সঙ্গীত-লহরী;—
তেমতি, যশস্বি, তুমি সুবঙ্গ-মণ্ডলে
গাও গো রামের নাম সুমধুর তানে,
কবি-পিতা বাল্মীকিকে তপে তুষ্ট করি!
অর্থ: প্রথম সনেটে মধুসূদন কৃত্তিবাসের নাম নিয়েই খেলা করেছেন। কৃত্তিবাস শব্দের আক্ষরিক মানে, চামড়া যাঁর পোশাক; এটি শিবের একটি নাম। কবি কিন্তু শব্দটির ধ্বনির সঙ্গে কীর্তি আর বসতি মিলিয়ে বলছেন, তোমার নামে চিরকাল কীর্তির বাস, যেমন কোকিলের কণ্ঠে সুর, ফুলের যৌবনে রূপ আর মানিকের গায়ে আলো। তাঁর কল্পনা, আগের জন্মের ভক্তির কথা মনে রেখে হয়তো সরস্বতী নিজেই স্বপ্নে বাবা-মাকে এই নাম বলে দিয়েছিলেন। শেষ ছয় লাইনে তুলনাটি হনুমানের: পবননন্দন যেমন সাগর পেরিয়ে রামের কানে সীতার খবর পৌঁছে দিয়েছিলেন, কৃত্তিবাসও তেমনি বাল্মীকিকে তপস্যায় তুষ্ট করে বাংলার ঘরে রামের নাম মধুর সুরে গেয়েছেন।
রামায়ণ
সাধিনু নিদ্রায় বৃথা সুন্দর সিংহলে।—
স্মৃতি, পিতা বাল্মীকির বৃদ্ধ-রূপ ধরি,
বসিলা শিয়রে মোর; হাতে বীণা করি,
গাইলা সে মহাগীত, যাহে হিয়া জ্বলে,
যাহে আজু আঁখি হতে অশ্রু-বিন্দু গলে!
কে সে মুঢ় ভূভারতে, বৈদেহি সুন্দরি,
নাহি আর্দ্রে মনঃ যার তব কথা স্মরি,
নিত্য-কান্তি কমলিনী তুমি ভক্তি-জলে!
দিব্য চক্ষুঃ দিলা গুরু; দেখিনু সুক্ষণে
শিলা জলে; কুম্ভকর্ণ পশিল সমরে,
চলিল অচল যেন ভীষণ ঘোষণে,
কাঁপায়ে ধরায় ঘন ভীম-পদ-ভরে।
বিনাশিলা রামানুজ মেঘনাদে রণে;
বিনাশিলা রঘুরাজ রক্ষোরাজেশ্বরে।
অর্থ: দ্বিতীয় সনেটের শুরুতে কবি বলছেন, সুন্দর সিংহলে, অর্থাৎ রামায়ণের লঙ্কায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ঘুমের কাছে তিনি বৃথাই সাধাসাধি করেছিলেন। তখন স্মৃতি বৃদ্ধ বাল্মীকির রূপ ধরে তাঁর শিয়রে বসে, বীণা হাতে সেই মহাগীত গাইলেন, যা শুনে আজও বুক জ্বলে, চোখে জল আসে। মাঝখানে সীতাকে সম্বোধন: ভারতে এমন মূঢ় কে আছে, তোমার কথা ভেবে যার মন ভেজে না? ভক্তির জলে তুমি চিরউজ্জ্বল পদ্ম। শেষ ছয় লাইনে গুরুর দেওয়া দিব্যদৃষ্টিতে কবি দেখেন জলের ওপর পাথর, যা সেতুবন্ধনের কথা মনে করায়, চলন্ত পাহাড়ের মতো কুম্ভকর্ণের রণে নামা, লক্ষ্মণের হাতে মেঘনাদ আর রামের হাতে রাবণের মৃত্যু। মেঘনাদের মৃত্যুই মধুসূদনের নিজের মহাকাব্যের বিষয়।
বাল্মীকি
স্বপনে ভ্রমিণু আমি গহন কাননে
একাকী। দেখিনু দূরে যুব এক জন,
দাঁড়ায়ে তাহার কাছে প্রাচীন ব্রাহ্মণ—
দ্রোণ যেন ভয়-শূন্য কুরুক্ষেত্র-রণে।
“চাহিস বধিতে মোরে কিসের কারণে?”
জিজ্ঞাসিলা দ্বিজবর মধুর বচনে।
“বধি তোমা হরি আমি লব তব ধন,”
উত্তরিল যুব জন ভীম গরজনে।—
পরিবরতিল স্বপ্ন। শুনিনু সত্বরে
সুধাময় গীত-ধ্বনি, আপনি ভারতী,
মোহিতে ব্রহ্মার মনঃ, স্বর্ণ বীণা করে,
আরম্ভিলা গীত যেন— মনোহর অতি!
সে দুরন্ত যুব জন, সে বৃদ্ধের বরে,
হইল, ভারত, তব কবি-কুল-পতি।
অর্থ: তৃতীয় সনেটটি একটি স্বপ্ন। গভীর বনে একা ঘুরতে ঘুরতে কবি দেখেন, এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের সামনে, আর ব্রাহ্মণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দ্রোণের মতোই নির্ভয়। ব্রাহ্মণ মধুর স্বরে জানতে চান, কেন তাঁকে মারতে চায় সে। যুবক গর্জে ওঠে, তোমাকে মেরে তোমার ধন কেড়ে নেব। তারপর স্বপ্ন বদলে যায়: কবি শোনেন অমৃতের মতো গান, যেন স্বয়ং সরস্বতী সোনার বীণা হাতে ব্রহ্মাকে মুগ্ধ করতে গান ধরেছেন। শেষ দুই লাইনে রহস্য খোলে: সেই দুরন্ত যুবকই বৃদ্ধের বরে হয়ে উঠলেন ভারতের কবিকুলের অধিপতি। এখানে সেই প্রচলিত কাহিনির ইঙ্গিত, যাতে বাল্মীকি আগে ছিলেন দস্যু।
বাংলার ঘরের রামায়ণ: কৃত্তিবাস ওঝা
বাংলায় রামায়ণের কথা উঠলে প্রথমেই আসে কৃত্তিবাস ওঝার নাম। প্রচলিত মতে তাঁর জন্ম নদিয়ার ফুলিয়া গ্রামে, আর সাধারণত তাঁকে পঞ্চদশ শতকের কবি বলে ধরা হয়। তবে তাঁর জন্মসাল, আর নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি যে গৌড়েশ্বরের সভায় যাওয়ার কথা বলেছেন সেই রাজা কে, এ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে।
তাঁর রচনা শ্রীরাম পাঁচালী নামে পরিচিত, যদিও লোকমুখে একে কৃত্তিবাসী রামায়ণই বলা হয়। বাল্মীকির মতো এখানেও সাতটি কাণ্ড, তবে প্রথমটির নাম আদিকাণ্ড। শতাব্দীর পর শতাব্দী এই বই সন্ধ্যাবেলা ঘরে পড়ে শোনানো হয়েছে, গায়েনরা আসরে সুর করে গেয়েছেন। নিরক্ষর মানুষও রামকথা জেনেছেন এই পাঁচালী শুনে।
পাঁচালী আর পয়ার
পাঁচালী হলো গেয়ে বা সুর করে পড়ার জন্য লেখা কাহিনিকাব্য। কৃত্তিবাস লিখেছেন মূলত পয়ার ছন্দে, যার প্রতিটি চরণে চোদ্দো অক্ষর, সাধারণত আট আর ছয়ে ভাগ করা, আর পাশাপাশি দুই চরণে অন্ত্যমিল। এই সহজ, দোলা-লাগা ছন্দ মনে রাখা সহজ, তাই মুখে মুখে ছড়াতেও সময় লাগেনি।
মুখে মুখে ছড়ানোর আরেকটা ফল হলো, কৃত্তিবাসের পাঠ এক জায়গায় স্থির থাকেনি। গায়েন, লিপিকর আর পরে সম্পাদকের হাতে নতুন অংশ যোগ হয়েছে, পুরোনো অংশ বদলেছে। উনিশ শতকের একেবারে শুরুতে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে বইটি ছাপা হয়, কিন্তু নানা পুথি আর ছাপা সংস্করণে আজও অনেক পঙ্ক্তি মেলে না।
বাল্মীকির সঙ্গে কৃত্তিবাসের তফাত
কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাল্মীকির অনুবাদ নয়, বাংলার মানুষের জন্য নতুন করে বলা রামকথা। রাম-সীতা-লক্ষ্মণের সংসারে ঢুকে পড়েছে বাংলার ঘরোয়া জীবন, আচার আর আবেগ। অনেক পণ্ডিতের মতে বাল্মীকির রাম মূলত আদর্শ মানুষ ও রাজা; কৃত্তিবাসের রাম অনেক বেশি করুণাময় ভগবান, যাঁর নামেই উদ্ধার, আর রাক্ষসদের মধ্যেও তাঁর ভক্ত আছে।
বাংলার রামকথায় এমন কয়েকটি কাহিনি জড়িয়ে আছে, যা বাল্মীকিতে নেই। তার অনেকগুলি কৃত্তিবাসের নামে প্রচলিত পাঠের মধ্য দিয়েই ঘরে ঘরে পৌঁছেছে। বাংলার ঐতিহ্য বিশেষ করে মনে রেখেছে এই কয়েকটিকে:
- রামের অকালবোধন
- প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী রাবণের সঙ্গে শেষ যুদ্ধের আগে রাম শরৎকালে, অর্থাৎ অসময়ে, দেবী দুর্গার পূজা করেন। একশো আটটি নীলপদ্মের একটি কম পড়লে তিনি নিজের পদ্মের মতো চোখ উৎসর্গ করতে যান, তখন দেবী দেখা দিয়ে বর দেন। বাংলার শারদীয় দুর্গাপূজার সঙ্গে এই কাহিনি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বাল্মীকিতে এই কাহিনি নেই; সেখানে যুদ্ধের আগে অগস্ত্য রামকে আদিত্যহৃদয় স্তোত্র, অর্থাৎ সূর্যের স্তব শেখান।
- রাক্ষসকুলের রামভক্ত
- প্রচলিত কৃত্তিবাসী পাঠে বিভীষণের ছেলে তরণীসেন রাবণের হয়ে যুদ্ধে নামলেও মনে মনে রামের ভক্ত। এমন চরিত্রের মধ্য দিয়ে কাহিনির ভেতরে ভক্তির সুর আরও গাঢ় হয়েছে।
- বাল্মীকির দস্যুজীবন
- রত্নাকর নামে এক দস্যু কীভাবে ঋষির কৃপায় বদলে গিয়ে বাল্মীকি হলেন, বাঙালির কাছে এই কাহিনি খুবই পরিচিত। বাল্মীকির নিজের রামায়ণে এই গল্প নেই; এটি পরবর্তী কালের গ্রন্থ আর লোককথার মধ্য দিয়ে ছড়িয়েছে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম ১৮২৪ সালে যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে, মৃত্যু ১৮৭৩ সালে কলকাতায়। ১৮৪৩ সালে তিনি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন, তখন থেকেই নামের আগে মাইকেল। প্রথম জীবনে ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন, পরে ফিরে আসেন বাংলায়, আর অল্প কয়েক বছরে বাংলা কবিতার চেহারাই বদলে দেন।
বাংলায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ, অর্থাৎ অন্ত্যমিলহীন প্রবহমান পয়ার, তাঁর হাতেই প্রতিষ্ঠা পায়, আর সনেটও তিনিই প্রথম বাংলায় আনেন। চতুর্দশপদী কবিতাবলীর সনেটগুলির বেশির ভাগ তিনি লিখেছিলেন ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে থাকার সময়; দূর দেশে বসে দেশের নদী, কবি আর পুরাণের কথা ভেবেই লেখা অনেকগুলি।
মেঘনাদবধ কাব্য: রামায়ণকে নতুন চোখে দেখা
১৮৬১ সালে প্রকাশিত মেঘনাদবধ কাব্য মধুসূদনের সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা। অমিত্রাক্ষর ছন্দে, নয়টি সর্গে লেখা এই মহাকাব্যের বিষয় রাবণের পুত্র মেঘনাদ, অর্থাৎ ইন্দ্রজিতের মৃত্যু। নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে বিভীষণের সাহায্যে লক্ষ্মণ নিরস্ত্র মেঘনাদকে বধ করেন, আর কাব্যের সহানুভূতি অনেকটাই পুত্রহারা রাবণ আর লঙ্কার দিকে।
অনেক সমালোচকের মতে এই কাব্যে রাবণ আর মেঘনাদই সবচেয়ে মানবিক, ট্র্যাজিক চরিত্র। প্রচলিত ভক্তির রামায়ণ থেকে এটা এক বড় সরে আসা, আর সে কারণেই বইটি নিয়ে প্রশংসা আর বিতর্ক দুটোই হয়েছে।
সনেটগুলি কেন প্রণাম
যে কবি রামায়ণকে এত সাহস নিয়ে নতুন করে লিখেছিলেন, তিনিই এই তিনটি সনেটে মাথা নত করেছেন পুরোনো কবিদের কাছে। কৃত্তিবাসকে তিনি দেখেছেন বাংলার ঘরে রামের নাম পৌঁছে দেওয়া দূত হিসেবে, বাল্মীকিকে ভারতের কবিকুলের পিতা হিসেবে।
রামায়ণ সনেটটি শেষ হয় মেঘনাদ আর রাবণের মৃত্যুর দৃশ্যে, যা তাঁর নিজের মহাকাব্যের জগৎ। ফলে তিনটি কবিতা মিলে একটা ধারা চোখে পড়ে: বাল্মীকি থেকে কৃত্তিবাস, আর কৃত্তিবাস থেকে মধুসূদনের নিজের কলম পর্যন্ত।
কৃত্তিবাসের পঙ্ক্তি কেন এখনও এখানে নেই
এই পাতার নাম বাংলায় রামায়ণ, অথচ কৃত্তিবাসের নিজের একটি পঙ্ক্তিও এখানে ছাপা হয়নি। কারণটা খোলাখুলি বলা দরকার: কৃত্তিবাসী রামায়ণের এমন কোনো পাবলিক ডোমেন প্রতিলিপি আমরা পাইনি, যা লাইন ধরে মিলিয়ে দেখা যায়।
আগেই বলা হয়েছে, এই বইয়ের পাঠ নানা সংস্করণে আলাদা। স্মৃতি থেকে বা যাচাই না করা প্রতিলিপি থেকে পঙ্ক্তি তুলে দিলে ভুল পাঠ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। যাচাইযোগ্য কোনো সংস্করণ পাওয়া গেলে কৃত্তিবাসের পাঠ এই পাতায় যোগ করা হবে।
সাধারণ প্রশ্ন
কৃত্তিবাসী রামায়ণ কি বাল্মীকি রামায়ণের অনুবাদ?
না। কৃত্তিবাস বাল্মীকির কাহিনির কাঠামো নিয়েছেন, কিন্তু বাংলার মানুষের জন্য নিজের মতো করে নতুন করে বলেছেন। অনেক কাহিনি যোগ হয়েছে, অনেক জায়গা বদলেছে, আর সবটার ওপর ভক্তির রং গাঢ়।
রামের অকালবোধনের কাহিনি কি বাল্মীকি রামায়ণে আছে?
না। বাংলার প্রচলিত বিশ্বাস এই কাহিনিকে কৃত্তিবাসী রামায়ণের সঙ্গে যুক্ত করে, আর শারদীয় দুর্গাপূজার উৎস হিসেবে বহু বাঙালি এটি মনে রাখেন। বাল্মীকিতে যুদ্ধের আগে রাম সূর্যের স্তব করেন, দুর্গাপূজার কথা সেখানে নেই।
রামায়ণ কে লিখেছেন, কবে?
ঐতিহ্য অনুযায়ী রচয়িতা বাল্মীকি, যাঁকে আদিকবি বলা হয়। পণ্ডিতদের মতে গ্রন্থটি কয়েক শতাব্দী ধরে বর্তমান রূপ পেয়েছে, মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতক থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম কয়েক শতকের মধ্যে, আর বালকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ডকে অনেকে পরের সংযোজন মনে করেন। সঠিক সময় নিয়ে মতভেদ আছে।
বাংলা লিপিতে লেখা সংস্কৃত শ্লোক কীভাবে উচ্চারণ করব?
বাংলায় সংস্কৃত পড়ার নিজস্ব রীতি আছে: শব্দের শুরুর য পড়া হয় জ-এর মতো, ব দিয়ে বর্গীয় আর অন্তঃস্থ দুই ব-ই বোঝায়, ক্ষ আর জ্ঞ-এর উচ্চারণও বাংলার ধাঁচে হয়। অন্য অঞ্চলে উচ্চারণ কিছুটা আলাদা। দুটোই প্রচলিত রীতি; পরিবারে বা গুরুর কাছে যেভাবে শিখেছেন, সেভাবেই পড়তে পারেন।
মধুসূদন খ্রিস্টান হয়েও রামায়ণ নিয়ে লিখলেন কেন?
১৮৪৩ সালে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করলেও রামায়ণ, মহাভারত আর পুরাণই ছিল তাঁর কাব্যের প্রধান উৎস। তাঁর লেখায় এই কাহিনিগুলি এসেছে দেশের সাহিত্য-ঐতিহ্য হিসেবে, আর এই সনেটগুলিতে বাল্মীকি ও কৃত্তিবাসের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা স্পষ্ট।
সূত্র
উপরের পাঠ এই পাবলিক ডোমেন সংস্করণগুলির সঙ্গে লাইন ধরে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। ব্যাখ্যা আমাদের নিজেদের লেখা।