বাংলায় হনুমান চালিসা
এই পাতায় তুলসীদাসের নামে প্রচলিত হনুমান চালিসার পুরো পাঠ আছে, অবধি মূল থেকে অক্ষর ধরে বাংলা লিপিতে লেখা। প্রতিটি দোহা ও চৌপাইয়ের সঙ্গে তার সহজ বাংলা অর্থ দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে আছে বাংলা লিপিতে পড়ার উচ্চারণ-নির্দেশ, স্তোত্রটির গঠন আর যে কাহিনিগুলির দিকে এটি ইঙ্গিত করে।
- সংস্করণ:
- তুলসীদাসের হনুমান চালিসা, অবধি মূল থেকে অক্ষর ধরে বাংলা লিপিতে; পাঠ মিলিয়ে দেখা হয়েছে ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ২৩ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখের সংস্করণে দেওয়া পূর্ণ পাঠের সঙ্গে, যা রামভদ্রাচার্যের গৃহীত পাঠ অনুসরণ করে।
- লেখা হয়েছে
হনুমান চালিসা: অবধি মূল, বাংলা লিপিতে
নিচে চালিসার পুরো পাঠ: শুরুর দুটি দোহা, চল্লিশটি চৌপাই আর শেষের দোহা, মোট তেতাল্লিশটি অংশ। শব্দগুলি অনুবাদ করা হয়নি; অবধি মূলের প্রতিটি অক্ষর বাংলা লিপিতে বসানো হয়েছে, তাই কোথাও কোথাও বানান বাংলার চেনা বানানের মতো নয়, যেমন গুন, বরন বা জস। পাঠ করার আগে এই পাতার উচ্চারণ-নির্দেশ একবার দেখে নিলে সুবিধা হবে।
সংস্করণ: ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ২৩ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখের সংস্করণে দেওয়া পূর্ণ পাঠ, যা রামভদ্রাচার্যের গৃহীত পাঠ অনুসরণ করে; দেবনাগরী থেকে অক্ষর ধরে বাংলা লিপিতে।
শুরুর দোহা ১
শ্রীগুরু চরন সরোজ রজ নিজ মন মুকুর সুধারি।
বরনউঁ রঘুবর বিমল জসু জো দায়কু ফল চারি॥
অর্থ: গুরুর চরণপদ্মের ধুলো দিয়ে নিজের মনের আয়না পরিষ্কার করে কবি রঘুবর, অর্থাৎ রামের নির্মল যশ বর্ণনা করতে বসছেন। সেই যশ চারটি ফল দেয়: ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষ। প্রায় এই রূপেই দোহাটি তুলসীদাসের রামচরিতমানসের অযোধ্যাকাণ্ডের শুরুতেও আছে।
শুরুর দোহা ২
বুদ্ধিহীন তনু জানিকৈ সুমিরৌং পবনকুমার।
বল বুধি বিদ্যা দেহু মোহিং হরহু কলেস বিকার॥
অর্থ: নিজের শরীর আর বুদ্ধিকে দুর্বল জেনে কবি পবনকুমার হনুমানকে স্মরণ করছেন। প্রার্থনা: আমাকে বল, বুদ্ধি আর বিদ্যা দাও, আমার কলেস অর্থাৎ ক্লেশ, আর বিকার, মানে মনের দোষ, দূর করো। বুদ্ধিহীন তনু কথাটি কবির বিনয়ের প্রকাশ।
চৌপাই ১
জয় হনুমান জ্ঞান গুন সাগর।
জয় কপীস তিহুঁ লোক উজাগর॥
অর্থ: জয় হনুমান, তুমি জ্ঞান আর গুণের সাগর। জয় কপীশ, অর্থাৎ বানরদের অধিপতি, স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতাল, এই তিন লোকে তোমার খ্যাতি উজ্জ্বল। এখান থেকেই শুরু চল্লিশটি চৌপাই, আর সেই সংখ্যা থেকেই স্তোত্রের নাম চালিসা।
চৌপাই ২
রাম দূত অতুলিত বল ধামা।
অংজনি পুত্র পবনসুত নামা॥
অর্থ: তুমি রামের দূত, অতুলনীয় শক্তির আধার। মা অঞ্জনার ছেলে বলে তোমার নাম অঞ্জনিপুত্র, আর পবনদেবের পুত্র বলে পবনসুত। প্রচলিত বিশ্বাসে হনুমানের জন্মের পেছনে বায়ুদেবতার আশীর্বাদ ছিল, তাই তাঁকে বাতাসের সন্তান বলা হয়।
চৌপাই ৩
মহাবীর বিক্রম বজরংগী।
কুমতি নিবার সুমতি কে সংগী॥
অর্থ: তুমি মহাবীর, পরাক্রমী, বজরংগী, অর্থাৎ বজ্রের মতো কঠিন অঙ্গের অধিকারী। তুমি কুমতি, মানে খারাপ বুদ্ধি দূর করো, আর যার বুদ্ধি শুভ, তার সঙ্গী হও। বাংলাতেও হনুমানের বজরংবলী নামটি সুপরিচিত।
চৌপাই ৪
কংচন বরন বিরাজ সুবেসা।
কানন কুংডল কুংচিত কেসা॥
অর্থ: এখানে হনুমানের রূপের বর্ণনা। তাঁর গায়ের রং সোনার মতো, সুন্দর বেশে তিনি শোভা পাচ্ছেন, কানে কুণ্ডল, মাথায় কোঁকড়া চুল। বরন মানে বর্ণ বা রং, আর কুংচিত কেসা মানে কুঞ্চিত কেশ।
চৌপাই ৫
হাথ বজ্র ঔ ধ্বজা বিরাজৈ।
কাঁধে মূঁজ জনেঊ সাজৈ॥
অর্থ: তাঁর হাতে বজ্র আর ধ্বজা, অর্থাৎ পতাকা, কাঁধে মুঞ্জ ঘাসের পৈতে। ছবিতে ও মূর্তিতে হনুমানকে সাধারণত গদা হাতে দেখা যায়, কিন্তু এখানে বলা হয়েছে বজ্র আর ধ্বজার কথা। জনেঊ মানে যজ্ঞোপবীত বা পৈতে।
চৌপাই ৬
শংকর সুবন কেসরী নংদন।
তেজ প্রতাপ মহা জগ বংদন॥
অর্থ: শংকর সুবন কথাটির আক্ষরিক অর্থ শিবের পুত্র; ভক্তদের অনেকে হনুমানকে শিবের অংশ বা অবতার বলে মানেন। কেসরী নংদন মানে বানররাজ কেসরীর আনন্দ, অর্থাৎ পুত্র। তোমার তেজ আর প্রতাপ বিশাল, সারা জগৎ তোমার বন্দনা করে।
চৌপাই ৭
বিদ্যাবান গুনী অতি চাতুর।
রাম কাজ করিবে কো আতুর॥
অর্থ: তুমি বিদ্বান, গুণী আর অত্যন্ত চতুর, রামের কাজ করার জন্য সব সময় আতুর, অর্থাৎ ব্যাকুল। করিবে কো কথাটি বাংলার সাধু ভাষার করিবে নয়; অবধিতে এর মানে করার জন্য, যেমন পরের চৌপাইয়ে সুনিবে কো মানে শোনার জন্য।
চৌপাই ৮
প্রভু চরিত্র সুনিবে কো রসিয়া।
রাম লখন সীতা মন বসিয়া॥
অর্থ: প্রভুর চরিত্র, মানে রামের কাহিনি শুনতে তুমি ভালোবাসো, তুমি তার রসিক। রাম, লখন অর্থাৎ লক্ষ্মণ, আর সীতা তোমার মনে বাস করেন। কেউ কেউ দ্বিতীয় লাইনের উল্টো অর্থও করেন: তুমিই রাম, লক্ষ্মণ আর সীতার মনে বাস করো।
চৌপাই ৯
সূক্ষ্ম রূপ ধরি সিয়হিং দিখাবা।
বিকট রূপ ধরি লংক জরাবা॥
অর্থ: সূক্ষ্ম, অর্থাৎ ছোট রূপ ধরে তুমি সীতাকে দেখা দিয়েছিলে, আর ভয়ংকর বিশাল রূপ ধরে লঙ্কা জ্বালিয়েছিলে। প্রথমটি অশোকবনে সীতার সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রসঙ্গ। দ্বিতীয়টি সেই কাহিনি, যেখানে রাবণের লোকেরা হনুমানের লেজে আগুন ধরিয়ে দিলে তিনি সেই আগুনেই লঙ্কা পুড়িয়ে দেন।
চৌপাই ১০
ভীম রূপ ধরি অসুর সঁহারে।
রামচন্দ্র কে কাজ সঁবারে॥
অর্থ: ভীম, মানে ভয়ংকর রূপ ধরে তুমি অসুরদের, অর্থাৎ রাক্ষসদের সংহার করেছ, আর রামচন্দ্রের সব কাজ সুসম্পন্ন করেছ। সঁবারে কথাটির মানে গুছিয়ে দেওয়া, সাফল্যের সঙ্গে শেষ করা।
চৌপাই ১১
লায় সঁজীবনি লখন জিয়াএ।
শ্রীরঘুবীর হরষি উর লাএ॥
অর্থ: সঞ্জীবনী এনে তুমি লক্ষ্মণকে বাঁচিয়েছিলে, আর রঘুবীর রাম আনন্দে তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। প্রচলিত কাহিনিতে যুদ্ধে শক্তিশেলের আঘাতে লক্ষ্মণ অচেতন হলে হনুমান ওষধির খোঁজে হিমালয়ে যান, আর ঠিক গাছটি চিনতে না পেরে পাহাড়ের চূড়াটাই তুলে আনেন।
চৌপাই ১২
রঘুপতি কীন্হীং বহুত বড়াঈ।
তুম মম প্রিয় ভরতহি সম ভাঈ॥
অর্থ: রঘুপতি রাম তোমার অনেক প্রশংসা করে বললেন: তুমি আমার কাছে ভাই ভরতের মতোই প্রিয়। রামায়ণে ভরত ভ্রাতৃপ্রেমের সবচেয়ে বড় উদাহরণ, তাই এই তুলনা হনুমানের প্রতি রামের ভালোবাসার গভীরতা বোঝায়।
চৌপাই ১৩
সহস বদন তুম্হরো জস গাবৈং।
অস কহি শ্রীপতি কংঠ লগাবৈং॥
অর্থ: হাজার মুখে তোমার যশ গাওয়া হোক, এই বলে শ্রীপতি, অর্থাৎ বিষ্ণুর অবতার রাম, তোমাকে কণ্ঠে জড়িয়ে ধরেন। সহস বদন বলতে অনেকে হাজার ফণার শেষনাগকে বোঝেন, যিনি হাজার মুখে হনুমানের গুণগান করেন।
চৌপাই ১৪
সনকাদিক ব্রহ্মাদি মুনীসা।
নারদ সারদ সহিত অহীসা॥
অর্থ: এই চৌপাই আর পরেরটি একসঙ্গে পড়তে হয়। সনক প্রমুখ ঋষি, ব্রহ্মা প্রমুখ দেবতা, বড় বড় মুনি, নারদ, সারদ অর্থাৎ সরস্বতী, আর অহীস, মানে নাগরাজ শেষ, সবাই তোমার গুণগান করেন। সনকাদি বলতে ব্রহ্মার চার মানসপুত্র সনক, সনন্দন, সনাতন আর সনৎকুমারকে বোঝায়।
চৌপাই ১৫
জম কুবের দিক্পাল জহাঁ তে।
কবি কোবিদ কহি সকৈং কহাঁ তে॥
অর্থ: যম, কুবের আর দিকপালেরা, অর্থাৎ নানা দিকের রক্ষক দেবতারাও যেখানে তোমার মহিমা পুরোপুরি বলতে পারেন না, সেখানে কবি আর পণ্ডিতেরা কী করে বলবেন? জম মানে যম; তুলসীদাসের অবধিতে অনেক য-দিয়ে-শুরু শব্দ জ দিয়ে লেখা হয়।
চৌপাই ১৬
তুম উপকার সুগ্রীবহিং কীন্হা।
রাম মিলায় রাজপদ দীন্হা॥
অর্থ: তুমি সুগ্রীবের বড় উপকার করেছিলে: রামের সঙ্গে তাঁর মিলন ঘটিয়ে তাঁকে রাজপদ পাইয়ে দিয়েছিলে। কাহিনি অনুযায়ী দাদা বালীর ভয়ে সুগ্রীব ঋষ্যমূক পর্বতে থাকতেন; হনুমানই রাম-লক্ষ্মণকে তাঁর কাছে নিয়ে যান, আর বালীবধের পর সুগ্রীব কিষ্কিন্ধ্যার রাজা হন।
চৌপাই ১৭
তুম্হরো মন্ত্র বিভীষন মানা।
লংকেশ্বর ভএ সব জগ জানা॥
অর্থ: তোমার মন্ত্র, অর্থাৎ পরামর্শ বিভীষণ মেনে নিয়েছিলেন, আর তিনি লঙ্কেশ্বর, মানে লঙ্কার রাজা হলেন; এ কথা সারা জগৎ জানে। রাবণের ভাই বিভীষণ রামের পক্ষে যোগ দেন, আর রাবণের মৃত্যুর পর রাম তাঁকেই লঙ্কার সিংহাসনে বসান।
চৌপাই ১৮
জুগ সহস্র জোজন পর ভানূ।
লীল্যো তাহি মধুর ফল জানূ॥
অর্থ: যুগ সহস্র যোজন দূরের সূর্যকে তুমি মিষ্টি ফল ভেবে গিলে ফেলেছিলে। প্রচলিত কাহিনিতে শিশু হনুমান উদীয়মান সূর্যকে পাকা ফল ভেবে লাফ দেন, তখন ইন্দ্রের বজ্র এসে লাগে তাঁর হনুতে, অর্থাৎ চোয়ালে; অনেকে বলেন, সেখান থেকেই হনুমান নাম। সাধারণ ব্যাখ্যায় সংখ্যাটি দিয়ে অকল্পনীয় দূরত্ব বোঝানো হয়েছে।
চৌপাই ১৯
প্রভু মুদ্রিকা মেলি মুখ মাহীং।
জলধি লাঁঘি গয়ে অচরজ নাহীং॥
অর্থ: প্রভুর আংটি মুখে রেখে তুমি সাগর পার হয়েছিলে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সীতার খোঁজে পাঠানোর সময় রাম হনুমানকে নিজের আংটি দেন, যাতে সীতা সেটি দেখে বোঝেন যে তিনি রামেরই দূত। মুদ্রিকা মানে আংটি, জলধি মানে সমুদ্র।
চৌপাই ২০
দুর্গম কাজ জগত কে জেতে।
সুগম অনুগ্রহ তুম্হরে তেতে॥
অর্থ: জগতের যত দুর্গম, কঠিন কাজ আছে, তোমার অনুগ্রহে সবই সহজ হয়ে যায়। জেতে আর তেতে শব্দ দুটির মানে যতগুলি আর ততগুলি: যত কঠিন কাজ, তোমার কৃপায় ঠিক ততগুলিই সহজ।
চৌপাই ২১
রাম দুআরে তুম রখবারে।
হোত ন আজ্ঞা বিনু পৈসারে॥
অর্থ: রামের দরজায় তুমিই পাহারাদার; তোমার আজ্ঞা ছাড়া কেউ ভেতরে ঢুকতে পারে না। ভক্তরা এর অর্থ করেন এভাবে: রামের কাছে পৌঁছাতে হলে হনুমানের কৃপা চাই। রখবারে মানে রক্ষক, আর পৈসারে মানে প্রবেশ।
চৌপাই ২২
সব সুখ লহৈ তুম্হারী শরনা।
তুম রক্ষক কাহূ কো ডর না॥
অর্থ: যে তোমার শরণ নেয়, সে সব সুখ পায়; তুমি রক্ষক থাকলে কাউকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শরনা মানে শরণ, আশ্রয়। ভক্ত আর রক্ষকের এই সম্পর্কই চালিসার শেষ দিকের অনেক চৌপাইয়ের মূল সুর।
চৌপাই ২৩
আপন তেজ সম্হারো আপৈ।
তীনৌং লোক হাঁক তে কাঁপৈ॥
অর্থ: নিজের তেজ তুমি নিজেই সামলাতে পারো, আর কেউ পারে না; তোমার এক হাঁকে, অর্থাৎ হুংকারে তিন লোক কেঁপে ওঠে। এখানে হনুমানের শক্তির বিশালতা বোঝানো হয়েছে, যার পাশে তাঁর বিনয় আর সংযম আরও উজ্জ্বল দেখায়।
চৌপাই ২৪
ভূত পিশাচ নিকট নহিং আবৈ।
মহাবীর জব নাম সুনাবৈ॥
অর্থ: মহাবীরের নাম শোনালে ভূত-পিশাচ কাছে আসে না। ভক্তদের বিশ্বাস, হনুমানের নাম ভয় দূর করে, তাই অনেকে অন্ধকার পথে বা ভয়ের মুহূর্তে এই চৌপাইটি মনে মনে আওড়ান।
চৌপাই ২৫
নাসৈ রোগ হরৈ সব পীরা।
জপত নিরংতর হনুমত বীরা॥
অর্থ: বীর হনুমানের নাম নিরন্তর জপ করলে রোগ নাশ হয় আর সব পীড়া দূর হয়, এ কথাই বলা হয়েছে এখানে। ভক্তরা এই লাইন থেকে মনের জোর আর সান্ত্বনা পান; তবে এটি ভক্তির ভাষা, অসুখে চিকিৎসার বিকল্প নয়।
চৌপাই ২৬
সংকট তেং হনুমান ছুড়াবৈ।
মন ক্রম বচন ধ্যান জো লাবৈ॥
অর্থ: যে মন, কর্ম আর বাক্য দিয়ে হনুমানের ধ্যান করে, হনুমান তাকে সংকট থেকে মুক্ত করেন। মন ক্রম বচন, অর্থাৎ ভাবনায়, কাজে আর কথায় একই নিষ্ঠা, ভারতীয় ভক্তিসাহিত্যে পূর্ণ সমর্পণের এক পরিচিত সূত্র।
চৌপাই ২৭
সব পর রাম তপস্বী রাজা।
তিন কে কাজ সকল তুম সাজা॥
অর্থ: তপস্বী রাজা রাম সবার ওপরে, আর তাঁর সব কাজ তুমিই সুসম্পন্ন করেছ। অনেকের ব্যাখ্যায় রামকে তপস্বী রাজা বলা হয়েছে, কারণ রাজ্যের অধিকারী হয়েও তিনি চোদ্দো বছর বনে তপস্বীর মতো জীবন কাটিয়েছিলেন।
চৌপাই ২৮
ঔর মনোরথ জো কোঈ লাবৈ।
তাসু অমিত জীবন ফল পাবৈ॥
অর্থ: আর যে কেউ অন্য কোনো মনোবাসনা নিয়ে তোমার কাছে আসে, সেও জীবনের অসীম ফল পায়। এখানে পাঠ তাসু, মানে তার; জনপ্রিয় অনেক সংস্করণে আছে সোই, মানে সে-ই। দুই পাঠে মূল ভাবের বড় তফাত হয় না।
চৌপাই ২৯
চারোং জুগ পরতাপ তুম্হারা।
হৈ পরসিদ্ধ জগত উজিয়ারা॥
অর্থ: চার যুগ জুড়েই তোমার প্রতাপ; তোমার খ্যাতি জগৎকে আলোকিত করে আছে। চার যুগ হলো সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর আর কলি। প্রচলিত বিশ্বাসে হনুমান চিরঞ্জীবী, তাই সব যুগেই তাঁর উপস্থিতির কথা বলা হয়।
চৌপাই ৩০
সাধু সংত কে তুম রখবারে।
অসুর নিকংদন রাম দুলারে॥
অর্থ: তুমি সাধু-সন্তদের রক্ষক, অসুরদের নিকন্দন, অর্থাৎ বিনাশকারী, আর রামের দুলারে, মানে আদরের প্রিয়জন। এক লাইনে কবি হনুমানের তিনটি পরিচয় দিলেন: রক্ষক, যোদ্ধা আর রামের স্নেহের পাত্র।
চৌপাই ৩১
অষ্ট সিদ্ধি নৌ নিধি কে দাতা।
অস বর দীন্হ জানকী মাতা॥
অর্থ: তুমি অষ্টসিদ্ধি আর নবনিধির দাতা; মা জানকী, অর্থাৎ সীতা তোমাকে এই বর দিয়েছেন। অষ্টসিদ্ধি হলো অণিমা, লঘিমা, মহিমা, গরিমা, প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, ঈশিত্ব আর বশিত্ব; নবনিধি বলতে কুবেরের নয় রকম ধনভান্ডার বোঝায়। কিছু সংস্করণে দীন্হ-এর জায়গায় দীন পাঠ, দুটিরই মানে দিলেন।
চৌপাই ৩২
রাম রসায়ন তুম্হরে পাসা।
সদা রহো রঘুপতি কে দাসা॥
অর্থ: রাম-রসায়ন তোমার কাছে আছে; তুমি চিরকাল রঘুপতির দাস হয়ে থাকো। রসায়ন মানে আয়ুর্বেদের শক্তিদায়ী ওষুধ; ভক্তদের কাছে রামনাম আর রামভক্তিই সেই অমৃত, যার ভান্ডার হনুমানের কাছে।
চৌপাই ৩৩
তুম্হরে ভজন রাম কো পাবৈ।
জনম জনম কে দুখ বিসরাবৈ॥
অর্থ: তোমার ভজনা করলে মানুষ রামকে পায়, আর জন্মজন্মান্তরের দুঃখ ভুলে যায়। এখানে হনুমান রামের কাছে পৌঁছানোর পথ; তাঁর প্রতি ভক্তি শেষ পর্যন্ত রামের দিকেই নিয়ে যায়।
চৌপাই ৩৪
অংত কাল রঘুবর পুর জাঈ।
জহাঁ জন্ম হরিভক্ত কহাঈ॥
অর্থ: জীবনের শেষে সে রঘুবরের পুরে, অর্থাৎ রামের ধামে যায়, আর যদি আবার জন্ম নেয়, তবে হরিভক্ত বলে পরিচিত হয়। এখানে মৃত্যুর পরের গতি নিয়ে ভক্তিধর্মের বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে।
চৌপাই ৩৫
ঔর দেবতা চিত্ত ন ধরঈ।
হনুমত সেই সর্ব সুখ করঈ॥
অর্থ: অন্য দেবতাকে মনে না রাখলেও শুধু হনুমানের সেবা করেই সব সুখ পাওয়া যায়। প্রচলিত ব্যাখ্যায় এখানে অন্য দেবতাকে ছোট করা হয়নি, বরং একনিষ্ঠ ভক্তির কথা বলা হয়েছে। খেয়াল রাখবেন, সেই শব্দটি এখানে বাংলার সেই নয়; অবধিতে এর মানে সেবা করে।
চৌপাই ৩৬
সংকট কটৈ মিটৈ সব পীরা।
জো সুমিরৈ হনুমত বলবীরা॥
অর্থ: যে বলবান বীর হনুমানকে স্মরণ করে, তার সংকট কেটে যায়, সব পীড়া মুছে যায়। পঁচিশ নম্বর চৌপাইয়ের মতোই এখানে দুঃখ থেকে মুক্তির ভরসা দেওয়া হয়েছে, যা ভক্তরা বিপদের দিনে বিশেষ করে মনে রাখেন।
চৌপাই ৩৭
জয় জয় জয় হনুমান গোসাঈং।
কৃপা করহু গুরুদেব কী নাঈং॥
অর্থ: জয় জয় জয় হনুমান গোসাঁই! গুরুদেবের মতো আমার ওপর কৃপা করো। গোসাঈং মানে প্রভু বা স্বামী। গুরু যেমন শিষ্যের দোষ জেনেও স্নেহে পথ দেখান, তেমনি হনুমানের কাছে করুণা চাওয়া হয়েছে। তিনবার জয় বলা গভীর ভক্তি আর আনন্দের প্রকাশ।
চৌপাই ৩৮
জো সত বার পাঠ কর কোঈ।
ছূটহি বংদি মহা সুখ হোঈ॥
অর্থ: যে কেউ এই পাঠ একশো বার করে, সে বন্দিদশা থেকে ছাড়া পায় আর মহাসুখ লাভ করে। সত বার মানে শতবার। এই লাইন মেনেই অনেকে বিশেষ দিনে একশো বার চালিসা পাঠ করেন। বন্দি শব্দটিকে অনেকে সংসারের বন্ধন অর্থেও বোঝেন।
চৌপাই ৩৯
জো যহ পঢ়ৈ হনুমান চালীসা।
হোয় সিদ্ধি সাখী গৌরীসা॥
অর্থ: যে এই হনুমান চালিসা পড়ে, তার সিদ্ধি হয়, অর্থাৎ সাধনা সফল হয়; গৌরীশ, মানে গৌরীর স্বামী শিব এর সাক্ষী। এখানে কবি স্তোত্রটির নিজের নাম বলেছেন। ভক্তদের কাছে শিবকে সাক্ষী রাখা এই আশ্বাসের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
চৌপাই ৪০
তুলসীদাস সদা হরি চেরা।
কীজৈ নাথ হৃদয় মহঁ ডেরা॥
অর্থ: তুলসীদাস চিরকাল হরির চেরা, অর্থাৎ দাস; হে নাথ, আমার হৃদয়ে তোমার ডেরা বাঁধো, মানে বাস করো। পুরোনো ভারতীয় কবিতায় শেষে কবির নিজের নাম বসানোর রীতি আছে, যাকে ভণিতা বলে; এই চৌপাইটি সেই ভণিতা।
শেষের দোহা
পবনতনয় সংকট হরন মংগল মূরতি রূপ।
রাম লখন সীতা সহিত হৃদয় বসহু সুর ভূপ॥
অর্থ: হে পবনতনয়, সংকটহরণ, তুমি মঙ্গলের মূর্তি। হে দেবতাদের রাজা, রাম, লক্ষ্মণ আর সীতাকে সঙ্গে নিয়ে আমার হৃদয়ে বাস করো। শেষ প্রার্থনায় হনুমান একা নন; যাঁদের সেবায় তাঁর জীবন, সেই রাম, লক্ষ্মণ আর সীতাকেও হৃদয়ে ডাকা হয়েছে।
তুলসীদাস আর অবধি ভাষা
গোস্বামী তুলসীদাস ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের কবি, রামভক্তির সবচেয়ে প্রিয় কবিদের একজন। প্রচলিত মতে ১৬২৩ সালে বারাণসীতে তাঁর মৃত্যু, তবে জন্মসাল নিয়ে মতভেদ আছে। তাঁর প্রধান কীর্তি রামচরিতমানস, উত্তর ভারতের ঘরে ঘরে যে রামকথা পড়া হয়, অনেকটা যেমন বাংলায় কৃত্তিবাস।
তুলসীদাস লিখেছেন অবধি ভাষায়, যা অযোধ্যা অঞ্চলের, অর্থাৎ পুরোনো অবধের ভাষা। হিন্দির সঙ্গে এর নিবিড় আত্মীয়তা, তবে ক্রিয়াপদ আর শব্দরূপ অনেকটাই আলাদা। প্রচলিত বিশ্বাসে চালিসাও তুলসীদাসের রচনা, আর শেষ চৌপাইয়ে তাঁর নাম আছে। কিছু গবেষক অবশ্য মনে করেন এটি তাঁর নামে প্রচলিত অন্য কোনো কবির লেখাও হতে পারে; বিষয়টি নিশ্চিতভাবে মীমাংসিত নয়।
বাংলা লিপিতে কেন
বহু বাঙালি ভক্ত হনুমান চালিসা পাঠ করেন, কিন্তু সবাই দেবনাগরী পড়তে পারেন না। তাই বাংলা লিপিতে ছাপা চালিসার ছোট বই অনেক দিন ধরেই চালু আছে, ঠিক যেমন বাংলায় সংস্কৃত মন্ত্র বাংলা অক্ষরে ছাপা হয়।
এখানে পাঠটি অনুবাদ করা হয়নি। দেবনাগরীর প্রতিটি অক্ষরের জায়গায় তার বাংলা প্রতিরূপ বসানো হয়েছে, ফলে শব্দগুলি অবধিই থেকেছে। এই কারণেই গুন, বরন, জস বা কলেসের মতো বানান চোখে একটু অচেনা লাগতে পারে; ওগুলি বাংলা বানানের ভুল নয়, মূল অবধি শব্দের হুবহু রূপ।
চালিসার গঠন
চালিসা শব্দটি এসেছে চালিস, অর্থাৎ চল্লিশ থেকে। স্তোত্রের মাঝখানে আছে চল্লিশটি চৌপাই, আগে দুটি দোহা আর শেষে একটি, সব মিলিয়ে তেতাল্লিশটি অংশ।
দোহার প্রতিটি লাইনে চব্বিশ মাত্রা, তেরো আর এগারোয় ভাগ করা। চৌপাইয়ের প্রতিটি লাইনে ষোলো মাত্রা, আর দুই লাইনের শেষে মিল। এই ছন্দ গাওয়া সহজ, তাই চালিসা সাধারণত সুর করে পাঠ করা হয়, একা বা অনেকে মিলে।
হনুমান কে
রামায়ণে হনুমান বানররাজ কেসরী আর অঞ্জনার পুত্র, আর পবনদেবের সন্তান বলে তাঁকে পবনপুত্র বা মারুতি বলা হয়। তিনি ছিলেন সুগ্রীবের মন্ত্রী, পরে রামের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দূত ও সেবক। সীতার খোঁজে সাগর পার হওয়া থেকে লঙ্কার যুদ্ধ পর্যন্ত বহু সংকটে তিনিই রামের ভরসা।
ভক্তদের কাছে হনুমান একসঙ্গে শক্তি, বুদ্ধি, বিনয় আর নিঃস্বার্থ সেবার প্রতীক। প্রচলিত বিশ্বাসে তিনি চিরঞ্জীবী, আর যেখানে রামকথা হয়, সেখানে তিনি উপস্থিত থাকেন। মহাবীর, বজরংবলী, পবনসুত, এমন নানা নামে তাঁকে ডাকা হয়।
চালিসায় যে কাহিনিগুলির ইঙ্গিত
চালিসা পুরো কাহিনি বলে না, এক-একটি চৌপাইয়ে রামায়ণের এক-একটি ঘটনার দিকে ইশারা করে। শ্রোতারা কাহিনিগুলি আগে থেকেই জানেন বলে এক লাইনেই পুরো দৃশ্য মনে পড়ে যায়।
এই কাহিনিগুলির বেশির ভাগ বাল্মীকি রামায়ণে আছে, তুলসীদাসের রামচরিতমানসেও আছে, তবে খুঁটিনাটি নানা রামায়ণে আলাদা। যেমন যুদ্ধে লক্ষ্মণ কার অস্ত্রে অচেতন হয়েছিলেন, সে বর্ণনা বাল্মীকি আর তুলসীদাসে এক নয়। নিচে চালিসার ক্রম ধরে নয়, পরিচিত কাহিনিগুলি আলাদা করে দেওয়া হলো।
- ফল ভেবে সূর্য
- চৌপাই ১৮: শিশু হনুমান উদীয়মান সূর্যকে পাকা ফল ভেবে গিলতে ছুটেছিলেন। আজকাল কেউ কেউ যুগ, সহস্র আর যোজন গুণ করে সূর্যের দূরত্ব মেলানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু যোজনের মাপ নিয়েই প্রাচীন গ্রন্থে নানা মত, তাই এটিকে পরবর্তী কালের ব্যাখ্যা হিসেবেই দেখা ভালো।
- রামের আংটি
- চৌপাই ১৯: রামের দেওয়া আংটি মুখে নিয়ে হনুমান সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কায় যান, আর সেই আংটি দেখিয়েই সীতার বিশ্বাস অর্জন করেন।
- লঙ্কাদহন
- চৌপাই ৯: অশোকবনে ছোট রূপে সীতার সঙ্গে দেখা করার পর রাবণের সভায় হনুমানের লেজে আগুন দেওয়া হয়, আর সেই আগুনেই তিনি লঙ্কা জ্বালিয়ে দেন।
- সঞ্জীবনী
- চৌপাই ১১: যুদ্ধে লক্ষ্মণ অচেতন হলে হনুমান হিমালয় থেকে ওষধি আনেন; ওষধি চিনতে না পেরে পাহাড়ের চূড়াটাই তুলে আনার ছবি আজও হনুমানের সবচেয়ে পরিচিত মূর্তিগুলির একটি।
- সুগ্রীব আর বিভীষণ
- চৌপাই ১৬ ও ১৭: হনুমানের মধ্যস্থতায় সুগ্রীব রামের বন্ধু হয়ে কিষ্কিন্ধ্যার রাজা হন, আর তাঁর পরামর্শ মেনে বিভীষণ পান লঙ্কার সিংহাসন।
কখন পাঠ করা হয়
হনুমানের পূজার জন্য মঙ্গলবার আর শনিবার বিশেষ দিন বলে ধরা হয়, তাই এই দুই দিনে মন্দিরে আর বাড়িতে চালিসা পাঠ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। হনুমান জয়ন্তীতে অনেক জায়গায় একটানা পাঠের আয়োজন হয়। উত্তর ভারতে এই উৎসব সাধারণত চৈত্র পূর্ণিমায় পালিত হয়, তবে অঞ্চলভেদে দিন আলাদা।
অনেকে প্রতিদিন সকালে বা সন্ধ্যায় একবার পাঠ করেন, কেউ কেউ বিপদের সময় বা কোনো কঠিন কাজের আগে। চৌপাই ৩৮ মেনে কেউ কেউ বিশেষ দিনে একশো বার পাঠ করেন। কোন নিয়মে পাঠ হবে, তা পরিবার আর সম্প্রদায়ের রীতির ওপর নির্ভর করে; চালিসা নিজে কোনো কঠিন বিধি বেঁধে দেয় না।
বাংলা লিপিতে পড়ার উচ্চারণ-নির্দেশ
বাংলা লিপিতে লেখা হলেও শব্দগুলি অবধি, তাই উচ্চারণ যতটা সম্ভব হিন্দির কাছাকাছি রাখাই ভালো। নিচের কয়েকটি বিষয় মনে রাখলে পাঠ অনেক সহজ হবে।
সবচেয়ে ভালো উপায় হলো অভিজ্ঞ কারও পাঠ শুনে শুনে মিলিয়ে নেওয়া। শুরুতে ধীরে, প্রতিটি শব্দ আলাদা করে পড়ুন; সুর আর গতি পরে আপনিই আসবে। উচ্চারণে সামান্য তফাত হলেও ভক্তির মূল্য কমে না, এমনটাই অনেক ভক্তের বিশ্বাস।
- এক ব, দুই ধ্বনি
- দেবনাগরীতে বর্গীয় ব আর অন্তঃস্থ ব আলাদা অক্ষর, বাংলা লিপিতে দুটোই ব। পবন, সুবন, দেবতা, আবৈ, পাবৈ শব্দে মূলে অন্তঃস্থ ব, যার উচ্চারণ হিন্দিতে অনেকটা ইংরেজি v বা w-এর মতো। বল, বুধি, বিদ্যা শব্দে মূলে বর্গীয় ব, সেগুলি বাংলার মতোই।
- য আর য়
- বাংলা রীতিতে শব্দের শুরুর য পড়া হয় জ-এর মতো, কিন্তু হিন্দিতে এর উচ্চারণ ইংরেজি y-এর মতো। চালিসায় এমন শব্দ একটিই, চৌপাই ৩৯-এর যহ; এটি পড়ুন প্রায় ইয়হ। শব্দের মাঝে বা শেষের য়-ও y, যেমন জয়, দায়কু, হোয়। আর যেখানে মূলেই জ, সেখানে জ-ই পড়ুন: তুলসীদাস অনেক য-দিয়ে-শুরু সংস্কৃত শব্দ জ দিয়ে লিখেছেন, যেমন জম, জুগ, জোজন, জস।
- অ-এর উচ্চারণ
- বাংলা উচ্চারণে অ বলতে ঠোঁট গোল হয়ে ও-এর দিকে যায়। হিন্দিতে অ বলা হয় ঠোঁট না গুটিয়ে, ছোট আ-এর কাছাকাছি। তাই জয়, পবন, চরন, মন শব্দের অ হিন্দির মতো খোলা আর হালকা রাখুন।
- ং-এর উচ্চারণ
- দেবনাগরীর অনুস্বার বাংলা লিপিতে ং হয়েছে, কিন্তু সব জায়গায় তা ঙ-এর মতো নয়। পরের ব্যঞ্জন অনুযায়ী পড়ুন: অংজনি যেন অঞ্জনি, কংচন যেন কঞ্চন, নংদন যেন নন্দন, কুংডল যেন কুণ্ডল। শব্দের শেষে ং থাকলে তা চন্দ্রবিন্দুর মতো নাকি সুর, যেমন নহিং, মোহিং, চারোং, গোসাঈং।
- জ্ঞ আর ক্ষ
- বাংলায় জ্ঞান শব্দটি বলা হয় গ্যাঁন-এর মতো, হিন্দিতে অনেকটা গিয়ান। ক্ষ বাংলায় ক্খ-এর মতো, হিন্দিতে ক্শ-এর কাছাকাছি, তাই রক্ষক হিন্দি উচ্চারণে প্রায় রক্শক।
পাঠভেদ
চালিসা মুখে মুখে আর অসংখ্য ছোট বইয়ে ছড়িয়েছে, তাই নানা সংস্করণে কিছু শব্দ আলাদা। এখানকার পাঠ নেওয়া হয়েছে ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ২৩ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখের সংস্করণ থেকে, যেখানে জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য পাঠভেদ বিচার করে যে পাঠ গ্রহণ করেছেন, সেটি দেওয়া আছে। আমরা অন্য বইয়ের পাঠ মিশিয়ে দিইনি।
দুটি তফাত সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে। চৌপাই ২৮-এ এখানে পাঠ তাসু, যেখানে জনপ্রিয় অনেক সংস্করণে আছে সোই। চৌপাই ৩১-এ এখানে দীন্হ, কোনো কোনো সংস্করণে দীন। দুই ক্ষেত্রেই অর্থের বড় তফাত হয় না, তাই আপনার পরিচিত পাঠে পড়তে চাইলে তাতে কোনো দোষ নেই।
সাধারণ প্রশ্ন
হনুমান চালিসা কে লিখেছেন?
প্রচলিত মতে তুলসীদাস, যিনি রামচরিতমানসের কবি। শেষ চৌপাইয়ে তাঁর নামও আছে। কিছু গবেষক রচয়িতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তবে কোনো পক্ষেই নিশ্চিত প্রমাণ নেই, আর ভক্তসমাজে চালিসা তুলসীদাসের রচনা হিসেবেই পরিচিত।
চালিসা কি হিন্দিতে লেখা?
চালিসার ভাষা অবধি, যা হিন্দির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, কিন্তু আজকের মান্য হিন্দি নয়। এই কারণে হিন্দি জানলেও কিছু শব্দ অচেনা লাগতে পারে, যেমন সুনিবে, করিবে বা তুম্হরো। প্রতিটি অংশের ব্যাখ্যায় এমন শব্দের মানে দেওয়া আছে।
সপ্তাহের কোন দিন চালিসা পাঠ করা হয়?
প্রচলিত রীতিতে মঙ্গলবার আর শনিবার হনুমানের বিশেষ দিন, আর হনুমান জয়ন্তীতে অনেকে বারবার পাঠ করেন। তবে বহু ভক্ত প্রতিদিনই পাঠ করেন। দিন বা সময় নিয়ে নিজের পরিবারের রীতি মেনে চলাই ভালো।
বাংলা লিপিতে পড়লে কি পাঠ শুদ্ধ হয়?
লিপি বদলালে শব্দ বদলায় না; এখানে প্রতিটি অক্ষর মূলের সঙ্গে মিলিয়ে বসানো হয়েছে। শুদ্ধতার প্রশ্নটি আসলে উচ্চারণের। এই পাতার উচ্চারণ-নির্দেশ মেনে পড়লে আর সম্ভব হলে অভিজ্ঞ কারও পাঠ একবার শুনে নিলে মূলের খুব কাছাকাছি পাঠ করা যায়।
আমার বইয়ের সঙ্গে কয়েকটি শব্দ মিলছে না কেন?
চালিসার নানা সংস্করণে ছোটখাটো পাঠভেদ আছে। যেমন এখানে চৌপাই ২৮-এ তাসু আর চৌপাই ৩১-এ দীন্হ, অনেক বইয়ে সেখানে সোই আর দীন। অর্থের বড় তফাত হয় না; পরিবারে যে পাঠ চলে আসছে, সেটি পড়তেও কোনো বাধা নেই।
সূত্র
উপরের পাঠ এই পাবলিক ডোমেন সংস্করণগুলির সঙ্গে লাইন ধরে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। ব্যাখ্যা আমাদের নিজেদের লেখা।